সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন ইশারার ভাষা নিয়ে কিছু কথা

ইশারার ভাষা নিয়ে কিছু কথা


পোস্ট করেছেন: bhorerkhobor | প্রকাশিত হয়েছে: 12/02/2017 , 2:39 pm | বিভাগ: বিশেষ প্রতিবেদন


শারমিন নাহার মিতু- গভীর ঘুমের মধ্যে মানুষের স্বপ্ন দেখা একটি সহজাত প্রবৃত্তি। স্বপ্নের মাঝে প্রায়ই আমরা কিছু বলতে পারি না। নড়াচড়া করতেও পারি না। মনে হয় যেন বোবা হয়ে গেছি। নার্ভ দুর্বল হলে এমনটা হয়। এ তো গেল স্বপ্নের কথা। যদি বাস্তবে ঘটে আমাদের সঙ্গে এমনটা কখনো। কেমন অসহনীয় একটা বিষয়। কিন্তু একবার ভাবেন তো তাদের কথা, যারা বাস্তবেই এমন প্রতিবন্ধকতার শিকার। এমন কত মানুষ আছে পৃথিবীতে। যারা শুনতে পায় না, ফলে মুখে কিছু বলতেও পারে না। তাদের আমরা মূক ও বধির বলে থাকি। প্রচলিতভাবে তাদের আমরা বোবা বলে চিনি। এ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের শিক্ষিত করতে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে যে বিশেষ ভাষার জন্ম হয়েছে তাই ইশারার ভাষা। আর ইংরেজিতে বলে ংরমহ ষধহমঁধমব। যার জন্ম সেই প্রাচীন যুগ থেকেই। দার্শনিক সক্রেটিসের ভাষায়- “If we handn’t a voice or tongue and wanted to express things to one another, wouldn’t we try to make things to make things by moving our hands” গ্রিকদের থেকে এ ভাষার যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় আরো উন্নত ও সহজতর হয়েছে। এই ইশারার ভাষার সঙ্গে মূকাভিনয়ের কিছু কিছু মুদ্রার অনেক মিল আছে।

ইশারার ভাষা কাকে বলে:
শারীরিক বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দিয়ে, মুখে কিছু না বলে ও কানে কিছু না শোনে শুধু দৃষ্টিশক্তি দিয়ে অন্যের সঙ্গে কথা বলার বা মনোভাব আদান-প্রদানের যে পদ্ধতি তাকে ইশারার ভাষা বলে। এ ক্ষেত্রে দু’হাত, হাতের আঙ্গুল, ঠোঁট, মুখ, চোখ ও গোটা শরীর নানা কৌশল ও ভঙ্গিকে এক একটি শব্দের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলোর সাহায্যে, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীরা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। এটাই তাদের ভাষা ও কথা বলার উপায়। বোবা মুখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা, কিছু নির্বাক মানুষের না বলতে পারা, অন্তরের কবিতাগুলোকে সমাজের সামনে উপস্থাপনের যে বিশেষ কৌশল তাকেই আমরা ইশারার ভাষা নাম দিয়েছি। যাকে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ নামেই সারাবিশ্ব চেনে। বিশ্বে এ ভাষাটির একই রূপ রয়েছে। অনেকটা ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজের মতো। কিন্তু এ ভাষা এক এক দেশে, এক এক রকমও আছে। আবার দেশের অভ্যন্তরে আঞ্চলিক ইশারার ভাষাও আছে। তবে বর্তমানে এএসএল কর্তৃক উদ্ভাবিত ভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ নামে পরিচিত।

মূকাভিনয় ও ইশারার ভাষা:
আমরা প্রায়-ই মঞ্চে বা কোনো টিভি চ্যানেলের পর্দায়, নির্দিষ্ট পোশাকে, মুখে বিভিন্ন রঙে সেজে, কিছু শিল্পীকে দেখি। মুখে বাকহীন থেকে নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তারা সমাজের নানাবিষয়কে আমাদের সামনে তুলে ধরেন। এ শিল্পকে আমরা মূকাভিনয় বলি। শিল্পের এ মাধ্যমটির অনেক মুদ্রাই, আমাদের ইশারার ভাষাতে পাওয়া যায়, অনেকটাই একই মুদ্রা, শীল্পটা আলাদা। একটি বোবা মুখের ভাষা, অন্যটি আর্ট। কিন্তু একদম আলাদা দুটি ধারা। একটি ভাষা যা পৃথিবীর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিছু মানুষকে, তাদের জীবনকে সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করে। আর তা হলো ইশারার ভাষা। এটা একটি জীবনকে চলতে সাহায্য করে তাকে গতি দান করে। অন্যটি মূকাভিনয়। এটা একটি আর্ট বা শীল্প। যা মঞ্চে দর্শকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়। যা বর্তমানে মানুষের বিনোদন ও জীবিকার উৎস। তবে এ দুটি মাধ্যমের সঙ্গে কিছু কিছু মিল আছে। ইশারার ভাষাতে এ মিমিকের কতগুলো মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ মিমিকের কাছে আমাদের ইশারার ভাষা একটু হলেও ঋণি। আর মিমিকের ভাষা বুঝতে অন্যদের তুলনায় মূক ও বধিরদেরই বেশি সুবিধা হয়। যারা সাধারণ নাটক, সিনেমা ও টিভি প্রোগ্রাম উপভোগ করা থেকে একেবারেই বঞ্চিত। তাদের জন্য এ শীল্পের মাধ্যমে বিনোদন এক উত্তম ব্যবস্থা। যার কোনো অদ্বিতীয় নেই।

ইতিহাস :
পৃথিবীর শুরু হতেই ইশারার ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। লিখিতভাবে ভাষাটি ৫ম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে প্রচলিত ছিল যেহেতু পৃথিবীর শুরু থেকেই স্বাভাবিক মানুষের পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তা মূক ও বধির ব্যক্তিকেও পাঠিয়েছেন দুনিয়ায়। সেহেতু তাদের ভাষা তো থাকবেই। হয়তো তখন সে ভাষার কোনো নাম দেয়া ছিল না। বা তাকে লিপিবদ্ধও করা হয়নি। কিন্তু তারা যেভাবেই তাদের ভাবের আদান-প্রদান করতেন, সেই ইশারাগুলোই ছিল ইশারার ভাষা। ওয়েস্টার্ন সোসাইটিতে ইশারার ভাষার যাত্রা শুরু হয় সতেরো শতকের দিকে। অন্যদিকে ১৬২০-এ শাদ্রীদে জোয়ান পাবরো বনেট ‘রিডাকশন ডি লেস লিটারেসি আর্ট প্যারা’ তৈরি করেন যারা কথা বলতে পারে না তাদের জন্য। এখানে বলা হয়েছে যে, তালাবদ্ধ মানুষের কথা বলার একটি কলা বা আর্ট। অর্থাৎ, তিনি একে বধির ও বোবা ব্যক্তির জন্য শিক্ষার একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করেন। এটি প্রথম আধুনিক ফনেটিক ইশারার ভাষা ছিল। যা ছিল মূক ও বধিরদের জন্য একটি মৌখিক শিক্ষা ব্যবস্থা। যাকে ম্যানুয়াল অ্যালফাবেটের মাধ্যমে শেখানো হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে, বিভিন্ন মানুষের গবেষণার সাহায্যে আজকের ইশারার ভাষার রূপ পেয়েছে। পরে এসেছে আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ এএসএল। যা গোটা ইশারার ভাষাকে বদলে দিয়েছে।

গোপন সংকেত ও তথ্যে ইশারার ভাষা:
অতীতে রাজ্য চালাতে দেশে দেশে গোপন বার্তা প্রেরণ করতে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। এভাবে গোপন তথ্য বা বার্তা দেয়া হতো। যেগুলোকে বিভিন্ন সংকেত, চিহ্ন, চিত্র ও ছবির মাধ্যমে লেখা থাকত। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। শুধু পূর্ব হতে জানা ব্যক্তিরাই ওগুলো পড়তে পারত। ব্রিটেনে এভাবেই গোপনীয় বার্তা প্রেরণে ইশারা ভাষার ব্যবহার শুরু হয়। আবার মিসরীয় সভ্যতায় আমরা বিভিন্ন চিহ্ন, সংকেত ও চিত্রের খোঁজ পাই, যেগুলো ইশারা ভাষার অঙ্গ। ফনেটিক ভাষায়ও এর মিল রয়েছে। বর্তমানে রাস্তার পাশে বিভিন্ন সিগন্যালে ইশারার ভাষা আমরা দেখতে পাই। যেমন পথচারী পারাপার, জেব্রাক্রসিং, সামনে স্কুল, আস্তে চলুন, বিপদ সংকেতসহ নানা সাংকেতিক চিহ্নের ইশারা ভাষা রয়েছে সর্বসাধারণের জন্য। অর্থাৎ যেগুলো সবার জন্যই প্রযোজ্য, শুধু ইশারার ভাষাভাষীদের জন্য নয়।

Comments

comments

Close