সর্বশেষ সংবাদ
মতামত স্বাধীনতার মূল কথা জাতীয় ঐক্য

স্বাধীনতার মূল কথা জাতীয় ঐক্য


পোস্ট করেছেন: bhorerkhobor | প্রকাশিত হয়েছে: 03/26/2019 , 6:01 am | বিভাগ: মতামত


২৬ মার্চ এই জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনেই সূচনা হয় স্বাধীনতা অর্জন-উদ্যোগের মৃদু স্রোতধারা। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় জীবনের বিস্তীর্ণ উপত্যকার হাজারো প্রান্তে অঝোরে ঝরা অসংখ্য রক্তস্রোতের সম্মিলিত প্রবাহে তা সমাজ জীবনের দু’কূল ছাপিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে শুরু করে বেগবতী স্রোতস্বিনীর গতিতে, ১৬ ডিসেম্বর থেকে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ তখন থেকে শুরু করে তার জয়যাত্রা। তখন থেকে শুরু হয় এই জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার নতুন প্রবাহ। সূচনা হয় রক্তরঞ্জিত পতাকাবাহী জনসমষ্টির বিশ্বজয়ী নতুন উদ্যোগ। সূচনা হয় বিশ্বের মানচিত্রে গর্বিত অবস্থান গ্রহণকারী বাংলাদেশের জনগণের সৃজনশীল কর্মের নতুন অধ্যায়। এই দিনটিকে তাই এই জাতি স্মরণ করে আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীকরূপে। মনে রেখেছে হাজার বছরের ইতিহাসে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের দিগ্‌দর্শনরূপে।

এক কথায়, জাতীয় জনসমাজ বলতে যা বোঝায়, সেই জাতীয় জনসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় স্বাধীনতার দাবিতে। ২৫ মার্চের রাতে যখন পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হয় নিরস্ত্র-নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে, তাদের রক্ত ঝরাতে, সেই রক্তের প্রবাহ থেকেই জন্ম লাভ করে ২৬ মার্চ। সেদিন থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের যুদ্ধ। প্রকৃত অর্থেই এক জনযুদ্ধ। আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবি তখন থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। দলীয় কর্মসূচি রূপান্তরিত হয়েছে এই ভূখণ্ডের আপামর জনসাধারণের প্রাণের দাবিতে। তাই দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা দলীয় আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ কোনো দলের কর্মীর মধ্যে সীমিত থাকেননি। দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে, জাতীয় স্বার্থকে ধারণ করে, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে স্বাধীনতা অর্জনে দৃঢ় প্রত্যয় বুকে নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন জাতীয় জীবনের সেই সংকটময় মুহূর্তে। সবাই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক পঙ্‌ক্তিতে। দাঁড়িয়ে ছিলেন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর গভীর ষড়যন্ত্র অনুধাবন করে সেই ষড়যন্ত্রের শতগ্রন্থি ছিন্ন করতে। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে টিকে থাকতে। এই প্রেক্ষাপটেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা সম্ভব।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতের প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে মুক্তিযুদ্ধ অল্প সময়ে লাভ করে তার সফল ও যৌক্তিক পরিণতি। স্বাধীন বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দান করে ভারতই। এসব কারণে বাংলাদেশের জনগণ সবসময় গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ভারতের সহযোগিতাকে স্মরণ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জয়যাত্রা শুরু করার সময় বাংলাদেশ তাই ভারতকে কামনা করেছে সবসময় এক মহান প্রতিবেশী হিসেবে। কারণ বাংলাদেশের জন্মক্ষণে ভারত ও পূর্ব বাংলার জনসমষ্টির একাংশের রক্ত এই মাটিতে মিশে গিয়ে দুই রাষ্ট্রের সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিকে শুধু সুদৃঢ় করেনি, করেছে ঘনিষ্ঠতম এবং পরম পবিত্র। বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ এখনও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এই আলোকেই দেখে থাকেন। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ কিন্তু কোনো সময় তেমন মর্যাদার আসন লাভ করেনি। ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কে কেন জানি আজও বিদ্যমান রয়েছে এক ধরনের ভালোবাসা ও ঘৃণার আবহ, এক রকমের আস্থা ও সন্দেহের ভাব।

অত্যন্ত সচেতন বিচার-বিশ্নেষণের পরেই ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সার্বিক সহায়তার হাত প্রসারিত করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মতে, রাজনৈতিকভাবে না হলেও অন্তত অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ‘একীভূত’ হবে। ১৯৪৭ সালের আগে দু’দেশের মধ্যে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল, তা পুনর্বহাল করা হবে। ভারতের অর্থনীতির সম্পূরক হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিন্যাসকে ভারতের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করা হবে। অন্য কথায়, বাংলাদেশের বাজার হবে ভারতের দখলকৃত এক বাজার। বাংলাদেশের নীতি ও কর্মসূচি হবে ভারতমুখী বা ভারতপন্থি। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ভারত। ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আর প্রয়োজন হবে না। পাকিস্তানের দুর্বৃত্ত শাসকরা অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন জনগণকে নিশ্চিহ্ন করে শুধু চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানকে। পূর্ব পাকিস্তানের মাটিকে। মাটির ওপর এবং নিচে যে সম্পদরাজি রয়েছে, তাই ছিল পাকিস্তানি শাসকদের লক্ষ্য। পাকিস্তানের রক্তপিপাসু জেনারেল টিক্কা খানের সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যকে স্মরণ করুন- ‘আমাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হোক, আমি সন্ত্রাসীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) নির্মূল করে পূর্ব পাকিস্তান ফিরিয়ে দেব’ অথবা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নিজের হাতে লিখিত নির্দেশনামা- ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ চত্বরকে লাল রক্তে রঞ্জিত করে দিতে হবে।’ (‘ÔThe green of East pakistan will have to be painted redÕ) দিকে দৃষ্টি দিন, অনুধাবনে এতকুটু অসুবিধা হবে না যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু জনগণের মুক্তিযুদ্ধ।

সহায়তাদানকারী ভারতের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করা বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের (যারা তাদের ভাষায় ছিল নিছক সন্ত্রাসকারী) নির্মূল করে, পূর্ব পাকিস্তানকে একটি বন্দি ভূখণ্ডে রূপান্তরিত করে স্থায়ীভাবে এখানকার জনসমষ্টিকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা। এই চরম সংকটকালে এই জনপদের, জনসমষ্টি কিন্তু হতোদ্যম হননি। তাদের এই সংগ্রামকে কে সমর্থন করবে এবং কে করবে না, তাও তাদের মনে আসেনি। কোন পরাশক্তি তাদের পক্ষে এবং কোন কোন বৃহৎ শক্তি তাদের বিপক্ষে, তা পূর্ব বাংলার জনগণ তখন চিন্তায় আনেনি। তখনও বিশ্বব্যাংক ছিল। ছিল আইএমএফ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা। তারা মুক্তিযুদ্ধকে কোন আলোকে গ্রহণ করবে, তাও এ দেশের জনসমষ্টিকে দ্বিধান্বিত করেনি। পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত বাহিনীর সঙ্গে অসম যুদ্ধে রক্তের বন্যা প্রবাহিত করে পূর্ব বাংলার জনগণ যখন একটু একটু করে বিজয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন বিশ্বের জনমতের নৈতিক সমর্থন লাভ করতে শুরু করে। সেই পর্যায়েও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর কর্ণধারবৃন্দ বাংলাদেশের পক্ষে তেমন কথা বলেননি। বলেছেন অনেক পরে।

আজকের দিনে, জাতীয় নেতৃত্ব কী ভাবছেন এ বিষয়ে? জাতিসংঘ অথবা বিশ্বব্যাংক অথবা তথাকথিত দাতাগোষ্ঠীর বিষয়ে ভাববার আগে ৪৮ বছর আগের এই দিনটির মর্মকথা কি অনুধাবন করবেন একবার? সংঘাত নয়, সংহতি যে এর সুর, তা কি একবার অনুভব করবেন? বিভেদ নয়, ঐক্যবোধই যে এর মূল ছন্দ তা কেন আসে না স্মরণে? জাতীয় পর্যায়ে মর্যাদার ভিত্তি হলো জাতীয় ঐক্য। জাতির উজ্জ্বল ভাবমূর্তির জন্য অপরিহার্য ওই একটিই এবং তা হলো, জাতীয় ঐক্য। ২৬ মার্চের মূল কথাও তাই। এদিকে জাতীয় নেতৃত্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট হোক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

comments

Close