সর্বশেষ সংবাদ
অপরাধ, প্রসাশন অনিয়মের বেড়াজালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন

অনিয়মের বেড়াজালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন


পোস্ট করেছেন: Staff Reporter | প্রকাশিত হয়েছে: 07/23/2019 , 10:26 am | বিভাগ: অপরাধ,প্রসাশন


মমিনুর রহমান :  অব্যবস্থাপনা, অপরিচর্যা, আর প্রশাসনের হয়রানিতে কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়েছে দেশের জাতীয় রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও তৎসংলগ্ন এলাকাসমূহ। প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের রহস্যময় উদাসীনতা আর দুর্নীতির দাপটে শুধু স্টেশনের আগত যাত্রীসাধারণই নয়, স্টেশন লাগোয়া এজিবি কলোনি, জসিমউদ্দিন রোড, উত্তর ও দক্ষিণ কমলাপুর, মানিকনগর, মুগদা, বাসাবো, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর ও রেলওয়ে কলোনির অধিবাসিরাও রয়েছেন মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। ছিনতাইকারী, পকেটমার, মাদকসেবী ও কারবারি, জুয়াড়ি, চোরাকারবারি, আর যৌনকর্মীদের নানাবিধ অসামাজিক কার্যকলাপের কুপ্রভাবে এসব এলাকায় বসবাসকারীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমশ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। সরেজমিনে ঘুরে এলাকাবাসী ও স্টেশনে আগত বিভন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সাথে কথা বলে এমন চিত্রই দেখতে পাওয়া যায়।

অপরিচর্যায় ভিআইপি গেটঃ ভিআইপি গেটের প্রবেশ রাস্তার ডানদিকে গ্রীলে ঘেরা সৌন্দর্য্যবর্ধক ভাস্কর্য চত্বরের ভিতরে দিনে দুপুরে নির্বিঘ্ন ড্যান্ডি মাদক (একপ্রকার আঠা) শুঁকে ছিন্নমুল শিশুরা। প্রধান সড়ক ও ভাস্কর্য চত্বর লাগোয়া সংকীর্ণ ফুটপাতটির নিরাপত্তা গ্রীলগুলো প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। ফুটপাতটির শেষ মাথায় সিএনজি স্ট্যান্ডের পাশের ফুটপাতে বানানো হয়েছে উন্মুক্ত প্রস্রাবখানা। ফলে দুর্গন্ধে পথচলাই দায়। প্রবেশ রাস্তা পেরিয়ে একটু ভিতরে ঢুকলেই ভিআইপি গেটের মূল ফটক। ফটকের বিপরীতেই ট্যাক্সি ক্যাব স্ট্যান্ড। এই ক্যাব স্ট্যান্ডের পিছনের ফুটপাতেই সংসার পেতে বসেছে ছিন্নমূল বাসিন্দারা। খোলা আকাশের নিচে বিছানা পেতে কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ শুনছে গান, কেউ কেউ শুঁকছে ড্যান্ডি। অবস্থা দেখে মনে হবে এখানে কর্তৃপক্ষ বলে কিছুই নেই।

সিএনজি অটোরিক্সা স্ট্যান্ডের চাঁদাবাজিঃ ভিআইপি গেট পেরিয়ে স্টেশনের প্রধান গেটের প্রবেশমুখেই সিএনজি অটোরিক্সা স্ট্যান্ড। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার সিএনজি অটোরিক্সা যাতায়াত করে এই স্ট্যান্ড থেকে। স্টেশন থেকে বহির্গামী সিএনজি অটোরিক্সা থেকে ১৫ টাকা করে আদায় করা হয়। বিনিময়ে চালকদের হাতে কোন ছাপানো রশীদ দেয়া হয়না। অটোরিক্সা চালকরা চায় না বলেই বিনিময়ে কোন রশীদ দেয়না তারা। ৩/৪ টি সিএনজি অটোরিক্সা চালককে টোলের টাকা দিয়ে ‘রশীদ চান না কেন?’ জানতে চাইলে বলে, ‘চাইলে দিবো কেমনে? ওগো কাছে তো কোন রশীদই নাই। আপনি দেখেন খুইজা কোন রশীদ পান কি না? চালকদের কথায় আদায়কারীর কাছে রশীদ দেখতে চাইলে ‘আনছি’ বলে দ্রুত সটকে পড়ে।

আরএনবি’র ঘুষ বাণিজ্যঃ শৃংখলাহীণতার চরম পর্যায়ে রয়েছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী’র (আরএনবি) সদস্যরা। শুধু সাধারন যাত্রীগণতো বটেই, আরএনবি’র দুর্নিতি আর ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ গভঃ রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) সদস্যরা পর্যন্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিআরপি থানার এক কনস্টেবলকে পরিচয় দিয়ে ভাস্কর্য চত্বরের মাদকসেবিদের দেখাতেই বললেন, “ভাই আপনারা শুধু পুলিশের দুর্নিতিটাই দেখেন। প্ল্যাটফর্মে ঢোকার গেটে গিয়া দেখেন আরএনবি’র লোকেরা টিকেট চেকার (টিসি) হইয়া সরকারের টাকা কিভাবে লুটতাছে”। মেইন গেট পেরিয়ে টিকিট কাউন্টারের শেষে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার গেটের পূর্বকোণে ‘আরএনবি’র কিছু অসাধু সদস্য বিভিন্ন জেলাশহর থেকে আসা টিকিট বিহীন যাত্রীদের বিনা রশীদে জরিমানা’র নামে নগদ টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। যারা ‘আরএনবি’র দাবীকৃত টাকা দিতে না পারছে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গেটের সাথেই অবস্থিত টিসি অফিসরূমে। এই অফিস কক্ষটিই আরএনবি’র অঘোষিত লকআপ রূম। যারা দাবীকৃত জরিমানার টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, তাদের এই অফিসরূমে এনে চরম দূর্ব্যবহার আর অমানবিক আচরণ করা হয়। টাকা না দিলে জেলের ভয় দেখানো হয়। তখন কেউ বিকাশে টাকা আনিয়ে, কেউ মানিব্যাগের সব টাকা দিয়ে, যে যেভাবে পারে টাকা ম্যানেজ করে, অথবা মোবাইল, হাতঘড়ি যা পারে দিয়ে বেরিয়ে আসে ঐ লকআপ থেকে। আটক হওয়া মাত্র নগদ টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসা এমনই একজন টিকিট বিহীন যাত্রী শাহিন। বিনা টিকেটে কমলাপুর এসেছেন রাজধানীর বিমানবন্দর স্টেশন থেকে। গেটে ‘আরএনবি’র সদস্যদের ১০০ টাকা দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। জরিমানা দিয়ে কোন সরকারি কাগজের রশীদ পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ” এরা তো নিজেরাই এই টাকা ভাগ করে নেয়। সরকারের কোষাগারে কি আর এই টাকা যায়”? বিনা টিকেটে ট্রেণে ভ্রমণ করেন কেন, জিজ্ঞেস করলে বলে, কেউই তো টিকেট কাটেনা। তাই আমিও কাটিনা। মাঝে মধ্যে ধরা খাই। তখন দিয়া দেই যা চায়”। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় সহস্রাধিক যাত্রী বিনা টিকেটে বিভিন্ন গন্তব্য থেকে কমলাপুর স্টেশনে আসে। এদের প্রায় অর্ধেকই আসে ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশন থেকে। টিকেট চেকাররা আরএনবি’র কিছু অসাধু সদস্যদের সহায়তায় এই টিকেট বিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে অবস্থাভেদে বিনা রশীদে সর্বনিন্ম ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায় করে, যার একটি টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়না। শুধু আরএনবি’ই নয়, ঘুষ বাণিজ্য জড়িত আছে কিছু অসাধু আনসার সদস্যগণও। পণ্য পরিবহনের জন্য নির্ধারিত কন্টেইনার ডিপো’র (আইসিডি) উত্তর ও দক্ষিণ গেটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যগণ দিনচুক্তিতে ১০/২০ টাকা নিয়ে কন্টেইনার ডিপো’র ভিতর দিয়েই যাতায়াত করার সুযোগ করে দেয়। উত্তর গেটের চিত্র আরো করুণ। বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার অধিবাসিরা সময় বাঁচাতে এই পথেই চলাচলের সুযোগ নেয়। গেটের নিরাপত্তা কক্ষের বাইরে চলাচলের রাস্তা থাকলেও কক্ষের ঠিক পিছনটায় উন্মুক্ত প্রস্রাবখানা বানিয়ে রেখেছে। পথচারি বা অপেক্ষমান যাত্রীরা কেউ যখন ঐস্থানে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যায়, তখন আনসার সদস্যরা দেখেও না দেখার ভান করে। কিন্তু যেই প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন হয় ঠিক তখনি তাকে আটক করে সবাই মিলে। এবং বলে ঐস্থানে ২০ বালতি পানি ঢালতে হবে অথবা ২০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। এমনই একজন ভুক্তভোগী পারভেজ। “ফুটওভার ব্রীজ থাকতে নীচে দিয়ে কেন আসলেন আর জরিমানা কেন দিলেন” জিজ্ঞেস করতেই বললেন, এখানে এসেছিলাম একটা জরুরি কাজে। ফেরার পথে সময় কম থাকায় এবং বাথরুম সারতেই নিচ দিয়েই যাচ্ছিলাম। এখানে দুর্গন্ধ লাগায় বাথরুম করা যায় ভেবে গিয়েছি। তাছাড়া যখন গিয়েছি তখন উপস্থিত আনসার সদস্যরা কেউ বাঁধা না দেয়ায় ভাবলাম এখানে বাথরুম করা যাবে। তাই এমনটা করেছি। কিন্তু বাথরুম শেষ হতে না হতেই তিনজন আনসার সদস্য আমাকে আটক করে ২০০ টাকা জরিমানা দাবী করে। অন্যথায় ২০ বালতি পানি এনে উক্ত স্থানে ঢালতে বলে। অনেক কষ্টে হাতে পায়ে ধরে ৩০ টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছি ভাই’।

স্টেশনের যাত্রীদের ভীড়ে তৎপর থাকে সংঘবদ্ধ পকেটমার চক্র। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই পকেটমার চক্রের মূল হোতা মেম্বার। গত ১০ বছর যাবৎ এই মেম্বারের নের্তৃত্বেই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের সকল পকেটমাররা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। মুগদা এলাকায় বসবাসকারি কাউসার আকন্দ বলেন, জিআরপি থানার রহস্যময় উদাসীনতাই এই পকেটমার চক্রের শক্তি। কখনো যদি কোন পকেটমার সাধারণ জনতার হাতে ধরা পড়ে, জিআরপি থানার পুলিশ তৎক্ষণাৎ সিভিল পোষাকে গিয়ে ঐ পকেটমারকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এবং পরবর্তীতে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়েই নীরবে ছেড়ে দেয়।

অপরিছন্ন শৌচাগারঃ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম চত্বরের পূর্বকোণে ১ম শ্রেণী ও এসি কেবিনের যাত্রীদের জন্য ২ বছর আগে নির্মিত একমাত্র শৌচাগারটি রয়েছে বেহাল দশায়। শৌচাগারটি ভিআইপি যাত্রীদের জন্য হলেও এখানে সাবান, টয়লেট টিস্যু, হারপিক বা ফিনাইল কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। মেঝেতে লেপ্টে আছে নোংরা কাঁদা। এমনকি হাতমুখ ধোয়ার বেসিনে পর্যন্ত ময়লা কাঁদা লেগে আছে। শৌচাগারের পাহাড়ায় থাকা বাদল জানায়, এখানে কখনোই সাবান বা টিস্যু দেয়া হয়না। তবে যদি মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের কেউ আসে তখন সব ব্যবস্থা করা হয়। ২য় ও তয় শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য স্টেশনের টিকেট কাউন্টারের পূর্বদিকে ওয়েটিং রূমের একটি মাত্র বাথরূমই সকলের ব্যবহারের জন্য। তার অবস্থা আরো করুণ। বাথরূমের দরজা থেকে যাত্রীদের লাইন প্ল্যাটফরমে ঢোকার গেট পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। দুর্গন্ধে এক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই। নিরূপায় হয়েই যাত্রীদের তা ব্যবহার করতে হয়।

পার্শ্বেল চত্বরে যৌনকর্মিদের ভীড়ঃ একসময়ের জমজমাট মাদকসেবিদের আড্ডা ছিলো ১ নং প্ল্যাটফর্ম লাগোয়া পার্শ্বেল চত্বর। মাদক বিরোধী অভিযানের কারণে এখানে এখন মাদকসেবিদের আনাগোনা অনেকটা কম হলেও বেড়ে গেছে ভাসমান যৌনকর্মিদের ভীড়। ফলে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় মালামাল পাঠানোর জন্য আগত ব্যক্তিরা বেশ অস্বস্তির মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সারেন। এমনই একজন বেলাল। পার্শ্বেলে এসেছেন তার গ্রামের বাড়ীতে ফ্রীজ পাঠানোর জন্য। ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘ভাই আমি খুবই ধর্মপরায়ণ মানুষ। ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। অথচ দেখেন এখানে ঢোকার মুখেই ইশারা দিয়ে তারা (যৌনকর্মিরা) ডাকতে শুরু করেছে। কেমন লাগে বলেন ভাই’?

এসব কারণে শুধু স্টেশন এলাকাই নয়। আশেপাশের এলাকার বসবাসরত মানুষরাও রয়েছেন মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায়। মাদকসেবিদের একটা বড় অংশই ছিন্নমূল। এরা মাদকের জন্য হরহামেশাই স্টেশন লাগোয়া এলাকায় চলাচলরত অধিবাসিদের ব্যাগ, মোবাইল, গলার চেইন ইত্যাদি ছিনতাই করে থাকে। থানায় অভিযোগ করেও কোন ফল পাননি ভুক্তভোগীদের কেউই। আইন শৃংখলা, পকেটমার ও মাদকসেবিদের বিষয়ে জানতে কমলাপুর জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াসীন ফারুক মজুমদারের মুঠোফোনে কয়েকদফা কল দিলেও তিনি তা রিসীভ করেননি। আরএনবি’র ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে এ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডেট শহীদুল্লাহ’র মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা জেলা কমান্ড্যেট জহিরুল ইসলামের সাথে কথা বলতে অনুরোধ করেন। আরএনবি’র ঢাকা জেলা কমান্ড্যেট জহিরুল ইসলামের মুঠোফোন নাম্বারে দফায় দফায় বিরতি দিয়ে কল দিলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

Comments

comments

Close