সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ, প্রধান সংবাদ কুড়িগ্রামে করোনা আতঙ্কে শ্রমজীবি মানুষের দুর্বিসহ জীবন

কুড়িগ্রামে করোনা আতঙ্কে শ্রমজীবি মানুষের দুর্বিসহ জীবন


পোস্ট করেছেন: ভোরের খবর ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: 04/01/2020 , 5:31 pm | বিভাগ: জেলা সংবাদ,প্রধান সংবাদ


এজি লাভলু, স্টাফ রিপোর্টার

প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে লকডাউন হয়েছে বালাদেশের বিভিন্ন শহর ও জেলা-উপজেলা এলাকা। দেশব্যাপী বন্ধ হয়েছে গণপরিবহনসহ বিভিন্ন দোকানপাট। করোনার আতঙ্কে মানুষ দিশেহারা। স্থবির হয়েছে জীবনযাত্রা। আতঙ্কে দিন কাটছে শহর, মফস্বল ও চরাঞ্চলের মানুষদের। সীমিত হয়ে পড়েছে চলাচল। বিপন্ন জনজীবন।

উত্তর জনপদ সীমান্ত ঘেঁষা অবহেলিত জেলা কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলার অভ্যন্তরে ৪ শতাধিক চরাঞ্চল ও ৩ শতাধিক মফস্বল অঞ্চল এবং ৫০ পৌরগ্রাম অঞ্চলের শতকরা প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হতদরিদ্র ও দিন মুজুর। তারা নিত্যদিন শ্রম বিক্রি করে পরিবার নিয়ে কোনমতে জীবন নির্বাহ করেন। অভাব ও দারিদ্রতা তাদের নিত্যসঙ্গী।

এ জেলার বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ জীবনের প্রয়োজনে জীবিকার তাগিদে তারা বছরের ৬ থেকে ৯ মাস কুমিল্লা, ফেনী, টাঙ্গাইল, বগুড়া, ঢাকা ও সিরাজগঞ্জে শ্রম ফেরী করে। সে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে অতিকষ্টে দিন যাপন করাসহ সন্তানের লেখাপড়া ব্যয়ভার বহন করে আসছেন।

করোনাভাইরারে প্রভাবে লকডাউন এতে করে কর্মহীন হয়ে পড়েছে শ্রমজিবী, দিন মুজুর মানুষ। কাজ না থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। নিন্ম আয়ের মানুষগুলোর ঘরে খাবার না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলার অভ্যন্তরে চরাঞ্চল, মফস্বল অঞ্চল ও পৌরগ্রাম অঞ্চলের ৭০ শতাংশ হতদরিদ্র ও দিন মুজুর মানুষ এবং নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ বলছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার আগে যেনো তাদের না খেয়েই মরতে হবে। বিশেষ করে দিন মুজুর, ভ্যান চালক, রিকশা চালক, পানের দোকান, চায়ের দোকানদাররা পড়েছেন মহা বিপাকে। এছাড়াও হোটেল শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিকরাও কাজের অভাবে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন যাপন করছেন। এদিকে সরকার কর্তৃক ত্রাণ বিতরণ হলেও তা অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হত দরিদ্র, অসহায় ও দিন মুজুর, শ্রামজীবিদের অভিযোগ যাদের ঘরে খাবার আছে শুধু তারাই পাচ্ছেন এসব ত্রাণ। বঞ্চিত হচ্ছেন চরাঞ্চল ও গ্রামের অসহায় হত দরিদ্র, অসহায় ও দিন মুজুর, শ্রমজীবি পরিবারগুলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো শুধু মাস্ক, সাবান, সেনিটাইজার, হ্যান্ডগ্লোভ্স বিতরণ করলেও তারা অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর দিন যাপন করছেন বলেও জানান খেটে খাওয়া মানুষগুলো।

নাগেশ্বরী উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে জানা যায় এমন অনেক কষ্টের কথা। পৌর এলাকায় হাশেমবাজার, পৌর শহরের কলেজ মোড়, বাস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন মোড়গুলোসহ কচাকাটা, সুবলপাড় বাজারে দেখা যায় রিকশা চালকরা ভাড়ার আশায় সারিবদ্ধ হয়ে বসে আছেন রিকশা নিয়ে। পথে-ঘাটে লোকজন না থাকায় ভাড়া পাচ্ছেন না বলে জানান তারা। তারা আরও জানান তাদের স্ত্রী সন্তানদেরকে খাবার দেয়ার মতো ঘরে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ নেই। করোনা রোধে সরকার নিয়ম করলেও এসব নিয়মকে উপক্ষো করে পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে ভাড়ার খোঁজে ঘরের বাইরে বের হতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

পৌর এলাকায় হাশেমবাজার এলাকার রিকশাচলক কামাল হোসেন, আব্দুল আউয়াল, রিয়াজুল হক, আব্দুল আলিম, রুবেল হোসেন, বাবলু মিয়া, আনোয়ার হোসেন জানায়, তারা পেটের দায়ে ঘরের বাইরে বেরোনোর নিয়মকে উপেক্ষা করে রিকশা নিয়ে বের হলেও সারা দিনে মাত্র ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। মাঝে মাঝে খালি পকেটে বাড়ি ফিরতে হয়। যা আয় হয় তা দিয়ে বাজার খরচও হয়না।

সাতানি গ্রামের ফয়জুদ্দিন, আলতাফ হোসেন বলেন সারাদেশে এটা-ওটা দিতে শুনি, কিন্তু নাগেশ্বরীর হাশেমবাজারে কোনোদিন কিছুই পাইনি। চাকরিজিবীরা তাও মাস গেলে বেতন পায়। আমাদের দেখার কেউ নাই। দিন মুজুর দিতে না পারায় পরিবার নিয়ে অনাহারে আছি।

বল্লভেরখাস ইউনিয়নের রহিম, আফজাল, কহিরন বেওয়া, নাজমা বেগমসহ অনেকে বলেন, কাজ কাম না থাকায় এখন মহা বিপদে আছি। ইতিপূর্বে বল্লভেরখাস ইউপি চেয়ারম্যান আকমল হোসেন বন্যার ত্রাণ চাল সঠিকভাবে বিতরণ না করে আত্মসাতের বিষয়ে অনেক অভিযোগ করাসহ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলেও চেয়ারম্যানের কিছু হয়নি। বর্তমানে চেয়ারম্যান আকমল হোসেনের মাধ্যমে চাল ও টাকা বিতরণ করা হলে আমরা হত দরিদ্র মানুষেরা বঞ্চিত হবো।

কেদার ইউনিয়নের চর বিষ্ণুপুর এলাকার ফাতেমা বেগম, সাইফুর রহমান, সাদ্দাম হোসেন, দুলাল হোসেন, আইয়ুব আলীসহ অনেকে বলেন, আমাদের এ চরের মানুষের কোন জন প্রতিনিধি কখনো খোঁজ খবর নেন না। আমাদের দেখার কেউ নাই। দিন মুজুর দিতে না পারায় পরিবার নিয়ে অনাহারে আছি। এমন অভিযোগ হাজারও খেটে খাওয়া মানুষের।

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ৩৪ মেট্টিকটন চাল এবং ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ নয়টি উপজেলার মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপে ১৬২ মেট্টিকটন চাল বিতরণ চলমান রয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, আমরা আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করছি যাতে অসহায় এবং গরিব লোকগুলো ত্রাণ সয়ায়তা পান। তাছাড়া সরকার এ ব্যাপারে বেশ আন্তরিক আছেন। পর্যায়ক্রমে তাদেরকেও ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।

Comments

comments

Close